মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

একাত্তরে আরবপুর

১৯৭১ সাল মহান মুক্তিযুদ্ধের বছর। ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষন এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।  যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করো। বজ্র কণ্ঠের সেই শানিত নির্দেশনা রেসকোর্স ময়দান থেকে পদ্মা মেঘনা যমুনা গোমতী হয়ে আছড়ে পড়েছিল ভৈরব তীর যশোরেও।সারা বাংলার শহর বন্দর নগর থেকে গ্রাম গ্রামান্তর হয়ে পাড়া মহল্লা অব্দি ছড়িয়ে পড়েছিল সংগ্রামের মন্ত্র। সে মন্ত্রে দিক্ষীত হয়ে মুক্তি পাগলপারা বাঙালী জাতি হয়েছিল অকুতোভয়। মুক্তেশ্বরী পাড়ের আরবপুরের সংগ্রামী মানুষও সেইদিনে নিষ্ক্রিয় হয়ে ঘরে রুদ্ধ হয়ে ছিল না। মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল আর সবার মত।

মুরুব্বীদের বর্ণনা মতে, আওয়ামী লীগ আর মুসলিম লীগ দুটি পক্ষই সে সময় শক্তিশালী অবস্থানে ছিল। । আরবপুরের সাবেক চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান হবি মিঞা নেতৃত্ব দিতেন আওয়ামীলীগের আর সে সময়ের বর্তমান চেয়ারম্যান আবুল সরদার নেতৃত্ব দিতেন মুসলিমলীগের । মহান মুক্তিযুদ্ধেও দুটি পক্ষ পরস্পর বিরোধী অবস্থান নেয়। হবি মিঞা অবস্থান নেন মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আর আবুল সরদার  মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে। কবিরাজ আবুল হোসেন এবং আব্দুল জলিলের নেতৃত্বে একদিকে যেমন সংগঠিত হতে থাকে আরবপুরের মুক্তিযোদ্ধরা বিপরীতে থেমে থাকেনা রাজাকার আলবদর আল শামস বাহিনী গঠন। আবুল সরদারের নেতৃত্বে গড়ে উঠে রাজাকার বাহিনী। আরবপুর ইউনিয়ন পরিষদ রুপ নেয় হানাদার বাহিনীর সহযোগি প্রতিষ্ঠানে। চেয়ারম্যান আবুল সরদারকে সভাপতি এবং ধোপাখেলার সলেমান শেখ কে সম্পাদক করে গঠিত হয় আরবপুর পিস কমিটি ।

সে সময়ের টগবগে যুবা আশরাফ আলী, ইউসুফ আলী, নূর মোহাম্মদ, ওয়াজেদ আলী পুরন, মোসাদ্দেক হোসেন লিন্টু,জয়নাল আবেদীন,নুরুল ইসলাম, আব্দুর রশিদ,আব্দুল মালেক ঝন্টুর মতোই অন্যরা যেমন যোগ দিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে তেমনি আমিরুল্লাহ, রওশন, হায়দার,রব,মজিদ,আলাউদ্দীন, আব্দুল গণি, নূর ইসলাম, আকসির,সানাউল্লাহরা যোগ দিয়েছিল রাজাকার বাহিনীতে।

৩০ মার্চ ১৯৭১। হানাদার বাহিনী আরবপুরে সবচেয়ে নির্মম হত্যাকান্ড ঘটায় ধোপাখোলায়। শতাধিক লোককে লাইনে দাড় করিয়ে হত্যা করে ঘাতকরা। সে নির্মম হত্যাকান্ডে শহীদ হন ধোপাখেলার নজরুল ইসলাম, খলিলুর রহমান,ডাক্তার আব্দুস সাত্তার, আব্দুল আজিজ,আব্দুর রশিদ, সলেমান বিশ্বাস,জিন্নাত আলী, মফেজ বিশ্বাস, শামসুর রহমান, আবু বাক্কার, রবিউল ইসলাম, খোরশেদ বিশ্বাস, মফেজ সরদার, এশারত আলী, মহসিন আলী বিশ্বাস, রওশন আলী, মতিউল্লাহ বিশ্বাস, লুতফর রহমান, ওয়াজেদ আলী, হাসেম আলী, জাকিয়া বেগম, আক্কাস আলী, আব্দুল পাটোয়ারী, হোসেন আহম্মদ, গৌর গাঙ্গুলী,মখলেসুর রহমান, তেঘরিয়ার মকসেদ আলী, মোশারেফ আলী লিচু বিক্রেতা সহ আরো অনেকে। কাকতালীয়ভাবে ঐদিনেই কুমিল্লা ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টের আর্টিলারি পি এস এ( ৯৪১৯)ক্যাপ্টেন এম নুরুল ইসলাম ঘাতকের বুলেটে শহীদ হন।  ইতিহাসের কালের স্বাক্ষী হয়ে আজো টিকে আছে ধোপাখোলা বধ্যভূমি নাম নিয়ে।

মুক্তি সংগ্রাম দানা বেধে উঠার মূহূর্তে এপ্রিল মে এর মাঝামাঝি সময়ে দেয়াড়া ইউনিয়ন থেকে ফেরার পথে ঘেয়াঘাটে আমিরুল্লাহর নেতৃত্বে প্রকাশ্য দিবালোকে খুন হন হবি মিঞা। ধারালো অস্ত্রে কুপিয়ে হত্যা করে তার লাশ মুক্তেশ্বরী নদীর কচুরী পানার নিচে ডুবিয়ে রাখে ঘাতকেরা। কেন, কি কারনে এ হত্যাকান্ড তা বুঝতে বাকি থাকে না কারো।

যশোর ক্যান্টনমেন্ট ঘেষা আরবপুরে তখন রাজাকারদের দূর্দান্ত প্রতাপ। সে সময় কাধে চাইনিজ রাইফেল ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়াতো রাজাকারের দল। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ায় আব্দুল মালেক ঝন্টুর পিতা শেখ আছির উদ্দীনকে রাজাকারেরা ধরে নিয়ে পিস ক্যাম্পে। সেখানে তার উপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের উপর নির্যাতন অব্যাহত থাকে। রাজাকারের দেখানো পথে প্রায়শ: ক্যান্টনমেন্ট থেকে হানাদার বাহিনী প্রবেশ করে আরবপুরে। ধর্মতলা খোলাডাঙ্গা কিম্বা ভেকুটিয়া হয়ে খান সেনারা প্রবেশ করে পতেঙ্গালী, বি পতেঙ্গালী,মালঞ্চী ধোপাখোলায়। নির্বিচারের গুলিবর্ষন আর অগ্নি সংযোগ ছিল সে সময়ের নিত্ত নৈমত্তিক ঘটনা।ভেকুটিয়ার কালু ঘোষ,রফিউদ্দীন,খেয়াঘাটে খোলাডাঙ্গায় বাদশা মিয়া, আবুল নাজির, বি পতেঙ্গালীর ফণি ভূষণ চক্রবত্তী, পতেঙ্গালী কবিরাজ বাড়ীর সাকাওয়াত সরদার, কারিকার পাড়ার এরশাদ আলী সহ অনেককে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে হানাদার বাহিনী। রাজাকার বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন খোলাডাঙ্গার লুতফর রহমান।

যুদ্ধ তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। জল ডাঙ্গা আর আকাশে সম্মিলিত আক্রমনে দিশেহারা হয়ে পড়ে হানাদার বাহিনী।সাড়াশি আক্রমনে ৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর যশোর ছেড়ে পিছু হঠতে বাধ্য হয় পাকিস্থানী হানাদার বাহিনী। যশোরের সাথে হানাদার মুক্ত হয় আরবপুরও।  


Share with :

Facebook Twitter